আমার কাছে ১০০টির মত কেচো আছে। এইগুলা দিয়ে কয় কেজি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করা যাবে ?

প্রশ্ন

আমার কাছে ১০০টির মত কেচো আছে। এইগুলা দিয়ে কয় কেজি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করা যাবে ?

চলমান 0
নাঈম খান 2 weeks 1 উত্তর 34 views বুদ্ধিমান 0

উত্তর ( 1 )

  1. বিশেষ প্রজাতির কেঁচো ব্যবহার করে কোন উদ্ভিদ বা প্রাণীর বর্জ্য ও দেহাবশেষকে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর যে সার পাওয়া যায় তাই কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট নামে পরিচিত। জৈব পদার্থ খাওয়ার পর কেঁচো যে মল ত্যাগ করে তাই কেঁচো কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট নামে পরিচিত।
    মাটির লাল কেঁচো, খড়কুটো, ফসলের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্টাংশ এবং মাটির সমন্বয়ে যে জৈব সার তৈরি হয় তাকে ভার্মি কম্পোস্ট বা এ পদ্ধতিকে বলা ভার্মি কালচার। এটি জৈব পদার্থের একটি উৎস যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শস্য উৎপাদনের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উৎপাদন সরবরাহ করে যেমনÑ নাইট্রোজেন-২.৯% ফসফরাস-২.২%পটাসিয়াম-২.৩% সালফার-২.৬% ক্যালসিয়াম-৭.৪% ম্যাগনেসিয়াম-১.৫%, দস্তা-০.৫% বোরন-০.৯%।

    দরিদ্র কৃষক দম্পতি কেঁচো কম্পোস্ট করে স্বাবলম্বী : ঝিনাইদাহ জেলার কালীগঞ্জ থানার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক দম্পতি সামছুল ও মাজেদা বেগম হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের সহযোগিতায় কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি প্রশিক্ষণ নেন। প্রথমে মাজেদা ২ চেম্বার ১টি কম্পোস্ট প্লান্ট তৈরি করেন। পরবর্তীতে মাজেদা পাশের গ্রামের এক মহিলার নিকট ২৫০ গ্রাম কেঁচো ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। মাজেদার স্বামী সামছুল উপলব্ধি করেন কেঁচো কম্পোস্ট লাভজনক এবং তিনি নিজেও যোগদান করেন কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করতে। কৃষক সামছুল ২০১১ ও ১২ সাল এর বিভিন্ন সময় অর্গানিক চাষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে আবাসিক-অনাবাসিক ৪টি ট্রেনিং নেন। প্রথমে ১টি হাউস ও ১টি মাটির চাড়ি দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ১২২টি চাড়ি আছে যার মধ্যে সার তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে তার একটি গাভীও আছে। পূর্বে সামছুল-মাজেদার বসতবাড়ি ছাড়া চাষের কোনো জমি না থাকায় অন্যের বাড়িতে দিন মজুর হিসাবে কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে অন্যের জমিতে দিন মজুর হিসেবে কাজ করতে হয় না। নিজের বেশি গরু না থাকায় কম্পোস্ট সার তৈরি জন্য ৫০০ টাকা টলি হিসেবে গোবর ক্রয় করে।

    সফলতা : ১ বিঘা জমি প্রতি বছর ১১ হাজার টাকা জমির মালিককে দিয়ে ৫ বছরের জন্য লিজ নিয়ে সবজি চাষ করছেন। এছাড়াও ৬ কেজি কেঁচো বিক্রি করে ৬ বান টিন ক্রয় করে কম্পোস্ট সার তৈরির ঘর করেন।

    কেঁচো বিক্রি করে আয় : ২২ কেজি কেঁচো বিক্রি করেন ২ হাজার টাকা প্রতি কেজি অর্থাৎ ২০০০ী২২=৪৪,০০০ টাকা আয় করেন। কেঁচো বিক্রি করেন পাশের গ্রাম পাখিয়া, দুধরাজ, দুর্গাপুর, গোপালপুর, শৈলকুপা থানা, বাঘারপাড়া থানাসহ বিভিন্ন গ্রামে এখন বর্তমানে ১০০ কেজি কেঁচো মজুদ আছে যা দিয়ে সার তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদিত কেঁচো সার পান চাষি, ধান চাষি, সবজি চাষিদের কাছে বিক্রয় করা হয়।

    লেখাপড়া না জানলেও সামছুল-মাজেদা এখন কম্পোস্ট তৈরির প্রশিক্ষক। মানুষ যাতে সহজে সার তৈরি উপকরণ চাড়ি পায় তার জন্য নিজের বাড়ির সামনে মাটির চাড়ির দোকান ভাড়া দিয়েছেন পালদের (কুমার) কাছে। তাদের ইচ্ছা সার তৈরির চাড়ির সংখ্যা/আর বৃদ্ধি করে বেশি করে সার তৈরি করা এবং সার প্যাকেটিং করে বাজারজাত করা।

    ভার্মি কম্পোস্ট সারের গুণাগুণ ও উপকারিতা : ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করলে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। মাটিতে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়। জমিতে হাল চাষ করতে সহজ হয়। সহজে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা যায়। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুণ বৃদ্ধি করে। গাছের প্রয়োজনীয় ১৬টি খাদ্য উৎপাদনের অধিকাংশই এতে থাকে। অধিক ফসল উৎপাদন হয়। উৎপাদিত ফসলের গুণগতমান ভালো হয়। মাটির গঠন উন্নত করে। মাটির পিএইচের মাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ মাটির বিষক্রিয়া দূর করে। এ সারের গুণাগুণ মাটিতে দীর্ঘদিন অবশিষ্ট থাকে বলে পরবর্তী ফসলে সারের পরিমাণ কম লাগে।

    ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির উপকরণ : বিশেষ প্রজাতির কেঁচো, গ্যাস মুক্ত তাজা গোবর, স্যানেটারি রিং বা পাকা হাউস অথবা পাকা চাড়ি, চালা দেয়ার জন্য টিন বা খড়।

    রিং পদ্ধতিতে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি : প্রথমে একটা উঁচু স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেখানে সহজে পানি জমবে না বা সমতল জায়গার ওপর ১ ফুট উঁচু করে মাটি ফেলতে হবে। মাটিকে ভালোভাবে পিটিয়ে শক্ত করে তার ওপর পলিথিন বিছিয়ে দিতে হবে। পলিথিনের ওপর পর্যায়ক্রমে ২টি স্যানেটারি রিং বসাতে হবে অথবা ৪ ফুটx৩ ফুট x ১.৫ ফুট (দৈর্ঘ্যx প্রস্থx গভীরতা) পাকা হাউস তৈরি করে তার ওপর টিন, খড় বা পলিথিন দিয়ে চালা দিতে হবে। রিং এর মাঝে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকা রাখতে হবে যাতে করে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে। পাকা হাউসের দেয়ালে ১ ফুট পরপর ১ ইঞ্চি সাইজের পিভিসি পাইপ কেটে বসানো যেতে পারে। রিং বা হাউসে তাজা গোবর ভরাট করে এক সপ্তাহ রেখে দিতে হবে। যাতে করে গোবরের গ্যাস বের হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে গোবরগুলো নেড়ে-চেড়ে দিলে ভালো হয়। বিশেষ প্রজাতির কেঁচো প্রতি হাউসে ৫০০-৭০০টি করে ছাড়তে হবে। রিং বা হাউসের ওপরে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং মাঝে মধ্যে আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। রিং বা হাউসের বাইরের চারিদিকে মাঝে মধ্যে কেরোসিন ছিটিয়ে বা স্প্রে করে দিতে হবে, যেন কোন ধরনের পিঁপড়া আক্রমণ করতে না পারে।

    এভাবে ৩ মাস থাকার পর রিং বা হাউসের রাখা গোবর সম্পূর্ণ সার হয়ে যাবে। যা ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার নামে পরিচিত। রিং বা হাউসের গোবর যখন দেখা যাবে চা পাতার ঝুরঝুরে হয়েছে, তখন রিং বা হাউস থেকে তুলে নিয়ে চালুনি দিয়ে চালতে হবে। চালার পর চালুনের মধ্যে কেঁচো থেকে যাবে এবং সার নিচে পড়বে। সার পলি ব্যাগে প্যাকেট করে ১৮-২০% আদ্রতায় রাখা যায় ১ বছর পর্যন্ত। সার থেকে কেঁচো বের করার পূর্বেই কিছু গোবর গ্যাসমুক্ত করে প্রস্তুত রাখতে হবে। তারপর সার থেকে কেঁচো সংগ্রহ করে ওই নতুন গোবর কেঁচোগুলো কিছুদিন রাখা যাবে। তারপর পুনরায় রিং বা হাউসটি গোবর দিয়ে ভরাট করে কেঁচো ছাড়তে হবে। যা আগের মতো আবার সার হতে থাকবে।

    গর্ত পদ্ধতিতে প্রস্তুত প্রণালি : কম্পোস্ট সার তৈরির প্রধান উপাদান ভার্মি এসিনা ফোটিড়া জাতের বা বেশি লাল কেঁচো গরু মহিষের গোবর; শহর ও এর আশপাশের আবর্জনা, রান্নাঘরের ও সবজি বাজারের আবর্জনা, লতাপাতা, কাগজ কচুরিপানা, কলাগাছ ইত্যাদি।

    ভার্মি কম্পোস্ট প্রস্তুত প্রণালি : ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির জন্য প্রথমে পিট বা গর্ত করতে হয়। গর্তে ভার্মি কম্পোস্টের কাঁচামাল হিসেবে স্থানীয় ঘাস, আমের শুকনা পাতা বা খামারের উচ্ছিষ্টাংশের যে কোন একটির ২৫ কেজি নেয়া হয়। গর্তের তলদেশে এবং চারপাশে পলিথিন দ্বারা আবরণ দেয়া হয়, যাতে কেঁচোগুলো পিঠ হতে বাইরে চলে না যায়। আদর্শ গার্ডেন থেকে প্রাপ্ত মাটি এবং গোবর ১ঃ১ অনুপাতে গর্তের নিচে ১৫ সেমি. পুরু ভার্মি বেড তৈরি করতে হয় যাতে কেঁচোগুলো তাদের প্রাথমিক খাদ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এরপর স্থানীয় ঘাস দ্বারা তিনটি স্তরে সাজানো হয় এবং প্রতিটি স্তর সাজানোর সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি প্রয়োগ করা হয় যাতে মোট শুষ্ক ওজনের ৫০% আর্দ্রতা বিদ্যমান থাকে। প্রতি গর্তে প্রায় ২ হাজার কেঁচো প্রয়োগ করতে হয়। গর্তের উপরি ভাগে ভিজানো পাটের পানি থলে দ্বারা ঢেকে রাখা হয় এবং ভার্মি কম্পোস্টের গুণগতমান ঠিক রাখার জন্য গর্তের উপরে ছায়া প্রদানের ব্যবস্থা করতে হয়। গর্তের জন্য উত্তম তাপমাত্রা ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কেঁচোগুলো স্থানীয় ঘাস খেয়ে উত্তম ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে যা গাছের খাদ্য হিসেবে কাজ করে থাকে। এছাড়াও ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির জন্য চাড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে। চাড়ির মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির সময় পলিথিনের প্রয়োজন হয় না।

    পর্যবেক্ষণ : কম্পোস্ট বেড সর্বোক্ষণ চট বা ছালা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। তাপমাত্রা ২০-৩০ ডিগ্রি সে. এবং আর্দ্রতা ৪০-৬৫% এর মধ্যে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে হালকা পানি স্প্রে করতে হবে। খাবার শেষ হওয়ার আগেই নতুন খাবার দিতে হবে। সূর্যের আলো সরাসরি প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। ঘরের চারদিকে পানি ধরে রাখার জন্য ড্রেন করতে হয়।

    ব্যবহার বিধি : ফসল ভেদে যে কোন ফসলের জন্য প্রতি শতাংশ জমিতে ৩-৫ কেজি হারে কেঁচো সার মাটির সঙ্গে মিশাতে হবে। প্রতি শতাংশে ৩-৫ কেজি হারে কেঁচো সার ব্যবহার করলে ওই জমিতে আগের চেয়ে অর্ধেক (৫০%) রাসায়নিক সার করলেই চলবে। এ নিয়মে ৩-৪ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করলে পরবর্তীতে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করলেই চলবে। এ নিয়মে ৩-৪ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করলে পরবর্তীতে রাসায়নিক সারে ব্যবহার আরও কমে যাবে।

    সেরা উত্তর নির্বাচিত

উত্তর দিন

ব্রাউজ করুন